Logo
বিজ্ঞপ্তি
DBC বাংলা News এর জেলা এবং উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে

বিগত সময়ের চেয়ে মহামারী করোনাতেও বগুড়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে দ্বিগুণ

মাহফুজ মন্ডল, উত্তরাঞ্চল ব্যুরো প্রধান / ১৭৯
বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১


নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া : বিগত কয়েক মাস ধরে সারা দেশের ন্যায় বগুড়াতেও হঠাৎ করে বেড়ে গেছে আত্মহত্যার প্রবণতা। পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই প্রতিদিনই আত্মহননের নিষ্ঠুর সংবাদগুলো পাওয়া যায়।


করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বগুড়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২০ সালের মার্চ মাসে যখন করোনা ভাইরাসের আক্রমন শুরু হয়, তখন বগুড়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা কিছুটা কম থাকলেও চলতি বছরে ৬ মাসে আত্মহত্যার প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বগুড়া জেলার ১২ উপজেলার ১২ থানা এবং দুটি রেলওয়ে থানার অনুকূলে অপমৃত্যু সংক্রান্ত মামলা দায়েরের তথ্য অনুসন্ধান করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।


তথ্য অনুসন্ধান করে জানা গেছে, গত ২০২০ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে বগুড়ার এই ১৪ থানায় মোট অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে ১১৬ টি। ২০২১ সালের জানুয়ারী থেকে জুন মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত অপমৃত্যুর মামলা সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯১ টি। গত বছর ৯ মাসে গড়ে প্রতিদিন অপমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১২ টি। চলতি ২০২১ সালের প্রায় ৬ মাসে গড়ে প্রতিদিন অপমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩১ টি। অর্থ্যাৎ আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। করোনা ভাইরাস আগমনের আগে ২০১৯ সালে আত্মহত্যার প্রবণতার সংখ্যা ছিল মাট ৩৪৩ টি। গড়ে অপমৃত্যু হয়েছিল ২৮ জন। করোনার এই ছয় মাসে সে সংখ্যাকেও ডিঙ্গিয়ে ৫ ধাপ বেড়ে গেছে আত্মহত্যার প্রবণতা।


২০২১ সালে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে বগুড়া সদরের নারী, পুরুষ ও শিশু। তথ্যমতে, সদর উপজেলায় বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ৬৫ জন মানুষ। এরমধ্যে নারী ৩৫ জন, পুরুষ ৩০ জন। এরমধ্যে শিশু রয়েছে ৬ জন। গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে মারা গেছে ১৪ জন নারী, গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেছে ১৬ জন নারী, গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেছে ৬জন পুরুষ, গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে মারা গেছে ৮জন পুরুষ এবং বাকিগুলো পানিতে ডুবে, বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে এবং ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। বগুড়ার শিবগঞ্জে মোট মারা গেছে ১৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৯, নারী ৫ এবং শিশু ৫ জন। সোনাতলায় মোট ৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৪, নারী ৩। আদমদিঘীতে ৯ জন। পুরুষ ৬. নারী ১, শিশু ১। গাবতলীতে ৯জন। এরমধ্যে পুরুষ ৪, নারী ৪ শিশু ১ জন। ধুনটে ৭ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২ , নারী ৫। কাহালুতে ৫ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৪ , নারী ১। শেরপুরে ৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২, নারী ৫, শিশু ১। দুপচাঁচিয়ায় ১৭ জন। এরমধ্যে পুরুষ ১২, শিশু ৪, নারী ১। নন্দীগ্রামে ৮জন। এরমধ্যে পুরুষ ৪, নারী ৩ শিশু ১। সারিয়াকান্দীতে ১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫, নারী ৬, শিশু ১ জন। শাজাহানপুরে ১২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৫, নারী ৪, শিশু ৩। বোনারপাড়ায় রেল লাইনে কেটে মারা গেছে ১ জন অজ্ঞাত নারী। সান্তাহারে রেলে কেটে মারা গেছে ১২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ৯, নারী ৩। রেলের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননকারীদের সকলেই অজ্ঞাত বলে জানা যায়।
২০২০ সাল মার্চ টু ডিসেম্বর ৯ মাসে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বগুড়া সদর থানায় ৩৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ১৪ জন, নারী ১৫ জন, শিশু ৪জন। গলায় ফাঁস দিয়ে পুরুষ তিনজন, গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে পুরুষ চারজন, কীটনাশক পানে পুরুষ ৫ জন, বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট একজন, অজ্ঞাত কারণে একজন। গলায় ফাঁসি দিয়ে ৬ জন নারী, বিষপানে ৯ জন, ছাদের উপর থেকে লাফ দিয়ে একজন নারী মারা যায়। চার জন শিশুর মধ্যে একজন গলায় ফাঁস এবং বাকি তিনজন বিষপানে আত্মহত্যা করেছে।
শিবগঞ্জ থানায় অপমৃত্যুর সংখ্যা ১৫টি। এরমধ্যে পুরুষ ৭, নারী ৭ এবং শিশু ১। সোনাতলা থানায় মোট ৭ টি। এরমধ্যে পুরুষ ২ নারী ৫। এদের মধ্যে একজন বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট মৃত্যু। আদমদীঘি থানায় মোট ২১টি। পুরুষ ১২, নারী ৮ এবং শিশু ২। গাবতলী থানায় মোট মৃত্যু ৭ টি। এরমধ্যে পুরুষ ৩, নারী ২ এবং শিশু ২। কাহালু থানায় মোট ৩ টি। এরমধ্যে পুরুষ ২ জন নারী একজন। ধুনট থানায় মোট ৬ টি। এরমধ্যে পুরুষ দুই নারী দুই শিশু দুই। শেরপুর থানায় মোট ৪ টি। এরমধ্যে পুরুষ তিন, শিশু এক, নারী নাই। দুপচাঁচিয়া থানায় মোট ৩ টি। এরমধ্যে পুরুষ দুই, নারী এক। নন্দীগ্রাম থানায় মোট ৬টি। এরমধ্যে পুরুষ ৪, নারী এক, শিশু এক। সারিয়াকান্দী থানায় চার জন। এরমধ্যে পুরুষ দুই, নারী দুই, শিশু একজন। শাজাহানপুরে ৭ জন। এরমধ্যে পুরুষ পাঁচ, নারী এক শিশু একজন। ৯ মাসে মোট অপমৃত্যু ১১৬ জন। গড়ে প্রতিদিন অপমৃত্যুর হার ১২ জন।
২০১৯ সালে বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বগুড়া সদরের ১১৫ জন, শাজাহানপুরে ২১ জন, শেরপুরে ২৮ জন, নন্দীগ্রামে ১৪ জন, দুপচাঁচিয়ায় ৩৩জন, সারিয়াকান্দিতে ৫ জন, সান্তাহারে ৫জন, শিবগঞ্জে ২০জন, সোনাতলায় ১৯ জন, আদমদীঘিতে ১৮ জন, গাবতলীতে ২৪ জন, কাহালুতে ১৭ জন এবং বোনারপাড়া রেলওয়ে এলাকায় ২৪ জন। মোট ৩৪৩ জন। গড়ে প্রতিদিন অপমৃত্যুর হার ছিল ২৮ জন।
আত্মহননের পথ বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মো: জহির উদ্দিন জানান, মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি থাকে, যেমন- বিষ্ণণতা, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, মাদকাসক্ত, উদ্বেগে আক্রান্ত ইত্যাদি রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উচ্চ। বিষ্ণণতার রোগীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র আশাহীনতা তৈরি হয়। দুনিয়ার সবকিছু তারা নেতিবাচকভাবে দেখে। তারা নিজের সম্পর্কে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ও অন্য মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা পোষণ করে। তারা ভাবে, এ পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হবে এবং এটি পরিবর্তনের জন্য শত চেষ্টায়ও কোনো লাভ হবে না। এর চেয়ে মুক্তির একমাত্র উপায় নিজেকে মেরে ফেলা। এ চিন্তায় তাড়িত হয়ে তারা আত্মহত্যা করে। বিশ্লেষকরা জানান, অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে আত্মহত্যার হার বেড়ে যায়। সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যখন মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে, তখন আত্মহত্যার হারও যায় বেড়ে।

অনেকে আবার বাধ্য হয়েও আত্মহত্যা করে, যেমন : বন্দিশিবিরের তীব্র নির্যাতন সইতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীরা অনেক সময় আত্মহত্যা করে। অসুখের তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে অনেকে এ পথ বেছে নেয়।


সমাজ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন কোনো ব্যক্তির জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও উপলব্ধি-অনুধাবন শক্তি লোপ পায়, নিজেকে অসহায়-ভরসাহীন মনে করে, তখনই ধর্ম-কর্ম ভুলে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। প্রচণ্ড মনতাস্তি¡ক চাপও আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে। আবার জাগতিক দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে আত্মরক্ষা করতে দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিরা আত্মহননের মধ্য দিয়ে মুক্তি খোঁজে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলার কারণেও আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন ধর্মীয় বিশ্লেষকরা।

Print Friendly, PDF & Email


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও
Theme Created By ThemesDealer.Com